আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা নতুন করে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে মোড় নিয়েছে। মাসব্যাপী কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতিকে ‘মরণাপন্ন’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সমঝোতা কার্যত ‘লাইফ সাপোর্টে’ টিকে আছে।
সোমবার (১১ মে) হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধবিরতি এখনও কার্যকর থাকলেও তা অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। তার ভাষায়, “এটি এখন ম্যাসিভ লাইফ সাপোর্টে আছে।”
সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি পাল্টা প্রস্তাব পাঠায়। তবে সেই প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ এবং ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, তেহরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে এবং এখনো পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের প্রতিনিধিদের দেওয়া প্রতিক্রিয়া তার কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। একই সঙ্গে তিনি আবারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও এসেছে কঠোর প্রতিক্রিয়া। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বার্তায় বলেন, যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।
ইরানের দেওয়া ১৪ দফা পাল্টা প্রস্তাবে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকারের বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই তেহরানের প্রস্তাবকে ‘দায়িত্বশীল’ ও ‘উদার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে ইরান প্রস্তুত।
সংকট আরও জটিল করে তুলেছে ইসরায়েলের অবস্থান। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অপসারণ এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে মনে করার সুযোগ নেই।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থগিত, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালীতে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার পর গত মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে বর্তমানে ইরানের হরমুজ প্রণালী অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও।
পাল্টা চাপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করে তেহরানকে শর্ত মানতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও নতুন ঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি