আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল একাধিক সংকটের মুখোমুখি। চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতা পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর কেবল দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হিসেবে বিশ্বের প্রভাবশালী মার্কিন ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিত্বও বেইজিংয়ে গেছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক, চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান জেনসেন হুয়াং, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রধান টিম কুক এবং বিনিয়োগ খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তি ল্যারি ফিঙ্ক। এতে স্পষ্ট হয়েছে, রাজনৈতিক ও কৌশলগত টানাপোড়েন থাকলেও বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনো গভীরভাবে সংযুক্ত।
বেইজিং সফরের আগে ট্রাম্প বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে তার প্রথম অনুরোধ হবে মার্কিন ব্যবসার জন্য চীনের বাজার আরও উন্মুক্ত করা। তবে আলোচনার মূল বিষয় শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিরল খনিজ সম্পদ, নিষেধাজ্ঞা এবং বিশেষ করে ইরান সংকট ও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।
চীনা ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক গাও জিয়ানের মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের উত্তেজনা কিছুটা কমলে পুরো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে। তিনি মনে করেন, সাবেক মার্কিন প্রশাসনের সময় এশিয়ার দেশগুলোকে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে অঞ্চলটি বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর ওপর। এসব দেশ একদিকে অর্থনৈতিকভাবে চীনের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকটও ট্রাম্প-শি বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ইরানি তেল আমদানিতে চীন বড় অংশীদার হওয়ায় বেইজিংয়ের কূটনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। চীন বরাবরই বলে আসছে, যুদ্ধ নয়, আলোচনার মাধ্যমেই সংকটের সমাধান সম্ভব।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান অস্থিরতায় এশিয়ার অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশ জ্বালানি আমদানির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ইতোমধ্যে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প-শি বৈঠক থেকে বড় কোনো সমঝোতা নাও আসতে পারে। তবে অন্তত দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা কমানোর একটি কূটনৈতিক পথ তৈরি হতে পারে। তাদের ভাষায়, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এখন “প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও নিয়ন্ত্রিত সহাবস্থান”-এর পর্যায়ে অবস্থান করছে।