নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়েছে ব্রাজিল। একইসঙ্গে ব্রিকসে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে দেশটি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ব্রাজিলের রাজধানীতে অবস্থিত পালাসিও দো প্লানালতোতে লুলা দা সিলভা–র প্রধান উপদেষ্টা সেলসো আমোরিমের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থনের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন আমোরিম।
আগামী ২ জুন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচন। এ নির্বাচনে বাংলাদেশ–এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে সাইপ্রাস। এরই মধ্যে ব্রাজিলের পাশাপাশি আলজেরিয়া–ও বাংলাদেশের প্রার্থিতায় সমর্থন জানিয়েছে।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ ও কৌশলগত সমন্বয় আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সেলসো আমোরিম নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে দুই দেশের সহযোগিতা নতুন মাত্রা পাবে।
বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে সম্ভাবনার তুলনায় এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনও সীমিত বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সেলসো আমোরিম বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গঠনমূলক ভূমিকা, অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিকতার প্রতি অঙ্গীকার এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবেই ব্রাজিল এ সমর্থন দিচ্ছে।
ব্রাজিলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমান বিশ্ব যখন যুদ্ধ, বৈষম্য, জলবায়ু সংকট ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাহীনতার মতো জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সময়ের দাবি।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশের অর্থনীতি পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্রাজিল থেকে তুলা, সয়াবিন, চিনি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য আমদানি করছে। অন্যদিকে ব্রাজিলের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাটজাত পণ্য ও সিরামিক রপ্তানির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে সরাসরি শিপিং ব্যবস্থা চালু এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বৈঠকে কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, জ্বালানি ও উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। একইসঙ্গে চলতি বছরের ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনের পর দুই দেশের মধ্যে ফরেন অফিস কনসালটেশনস আয়োজনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে সমতা, মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে। জাতীয় স্বার্থ ও আত্মমর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়েই বর্তমান সরকার কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এসময় দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে সার্ক–কে পুনরুজ্জীবিত করার আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
অন্যদিকে ব্রিকসের সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানানো হলে সেলসো আমোরিম বলেন, বিষয়টি তিনি প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা–র সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) ঢাকায় একটি শাখা স্থাপনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এনডিবির সদস্য হলেও দেশে ব্যাংকটির কার্যকর শাখা না থাকায় সম্ভাব্য অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন সীমিত হয়ে রয়েছে।