আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
চলমান ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই এবার যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায়, ফ্লোরিডা প্রণালীর অনতিদূরে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা অভিযোগ করেছে, গত ৬৬ বছর ধরেই দেশটিতে সামরিক হামলার অজুহাত খুঁজে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ড্রোন হামলার অভিযোগ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
১৯৬০ সালের পর থেকে ওয়াশিংটন ও হাভানার সম্পর্ক ক্রমেই বৈরিতার দিকে গড়িয়েছে। ২০২৬ সালে এসে সেই দ্বন্দ্ব নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবরোধ, সামরিক চাপ ও রাজনৈতিক হুমকির কারণে কিউবার অর্থনীতি ও জনজীবন ভয়াবহ সংকটে পড়েছে বলে দাবি দেশটির সরকারের। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কারণেই কিউবা কার্যত প্রাক-শিল্পযুগের অন্ধকার বাস্তবতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে দাবি করে, কিউবার কাছে ৩০০টি ড্রোন রয়েছে এবং সেগুলো দিয়ে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে হাভানা। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ বলেন, “কিউবা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়। আমরা যুদ্ধ চাই না, তবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেব।”
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী আটক করার ঘটনার পর থেকেই লাতিন আমেরিকায় নতুন সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক অবস্থান কিউবাকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে কিউবার পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ। ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির বহু অঞ্চল দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকছে। এক কোটি মানুষের দেশটিতে খাবার, রান্নার গ্যাস ও ওষুধের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে গেছে, স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ঘরে বিদ্যুৎ না থাকলেও নিরাপত্তা বাহিনীর যানবাহনে ঠিকই জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে। এই বৈষম্যের প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভও হয়েছে।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে “একটি জাতিকে ধ্বংস করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, এটি শুধু রাজনৈতিক চাপ নয়, বরং পুরো জনগোষ্ঠীকে দুর্ভোগে ফেলার কৌশল।
ইতিহাস বলছে, ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হওয়ার পর থেকেই দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। ১৯৬১ সালে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সমর্থিত ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ হামলা এবং ১৯৬২ সালের ‘কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট’ দুই দেশকে সরাসরি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। সেই সংকটের পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কিউবায় আর সামরিক হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে সমালোচকদের মতে, বর্তমান মার্কিন নীতিতে সেই প্রতিশ্রুতির আর কোনো প্রতিফলন নেই।
এর মধ্যেই গত ২০ মে মার্কিন বিচার বিভাগ কিউবার সাবেক নেতা ৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালে একটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় হত্যার অভিযোগ আনে। এরপর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন উঠেছে—ভেনেজুয়েলার পর এবার কি কিউবাতেও সরাসরি অভিযান চালানোর পথ তৈরি করছে ওয়াশিংটন?
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে অনেক পিছিয়ে থাকা কিউবাকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের কৌশল ব্যবহার করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই চাপ নতুন সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে বলেই আশঙ্কা বাড়ছে।