প্রতি বছর শত প্রাণ ঝরে: বজ্রপাত রোধে এখনই দরকার গণসচেতনতা
অফিস ডেস্ক– আকাশ কালো হয়ে এলো। হঠাৎ দমকা বাতাস, তারপর মেঘের গর্জন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভয়ংকর আলোর ঝলকানি। মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বর্তমানে বজ্রপাত শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে।
একসময় বজ্রপাতকে মানুষ সাধারণ ঝড়-বৃষ্টির অংশ মনে করলেও এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক, জেলে, শ্রমিক, পথচারী, এমনকি ঘরের ভেতরেও মানুষ বজ্রপাতে আহত বা নিহত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, গাছপালা কমে যাওয়া এবং অসচেতনতার কারণে বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
কেন বাড়ছে বজ্রপাত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা যত বাড়ে, বায়ুমণ্ডলে তত বেশি শক্তি জমা হয়। এই শক্তির সংঘর্ষ থেকেই সৃষ্টি হয় বজ্রপাত। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক ও আর্দ্র দেশে গরমের সময় বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকে। ফলে কালো মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ দ্রুত জমা হয়।
এছাড়া—
বড় বড় গাছ কেটে ফেলা খোলা মাঠ বৃদ্ধি পাওয়া জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন অতিরিক্ত তাপদাহ অপরিকল্পিত বসতি ও উঁচু স্থাপনা বৃদ্ধি এসব কারণেও বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে? বাংলাদেশে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন— কৃষক জেলে মাঠে কাজ করা শ্রমিক নদীপথের মানুষ স্কুলগামী শিশু
ছাদে অবস্থানকারী মানুষ খোলা জায়গায় মোবাইল ব্যবহারকারীরা গ্রামে অনেক মানুষ ঝড়ের সময়ও মাঠে কাজ চালিয়ে যান। আবার শহরে অনেকে ছাদে দাঁড়িয়ে ভিডিও করতে যান। এই অসচেতনতাই বিপদ বাড়ায়। বজ্রপাতের সময় যা কখনো করা যাবে না খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না
বড় একা গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক নদী, পুকুর বা জলাশয়ে থাকা যাবে না ছাদে বা টিনের ঘরে অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তারের কাছাকাছি যাওয়া যাবে না ঝড়ের সময় মোবাইল চার্জে ব্যবহার না ক রাই ভালো মোটরসাইকেল বা সাইকেলে খোলা স্থানে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ
বজ্রপাত থেকে বাঁচার সহজ উপায়
১. মেঘের গর্জন শুনলেই সতর্ক হোন যদি বজ্রের শব্দ শোনা যায়, ধরে নিতে হবে বজ্রপাত কাছাকাছি হচ্ছে।
২. দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যান পাকা ভবন সবচেয়ে নিরাপদ। সম্ভব না হলে নিচু স্থানে বসে পড়ুন।
৩. মাঠে থাকলে কী করবেন? দুই পা একসঙ্গে করে নিচু হয়ে বসে পড়ুন। মাটিতে পুরো শরীর শুইয়ে দেবেন না।
৪. ঘরের ভেতরে কী করবেন? বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখুন জানালা থেকে দূরে থাকুন
তারযুক্ত ফোন ব্যবহার না করাই ভালো
৫. শিশুদের সচেতন করুন
বজ্রপাতকে ভয় নয়, সচেতনতার বিষয় হিসেবে শেখাতে হবে।
গাছ লাগানোও হতে পারে সুরক্ষা
পরিবেশবিদরা বলছেন, উঁচু ও বড় গাছ বজ্রপাতের শক্তি অনেক সময় নিজের দিকে টেনে নেয়। তাই পরিকল্পিতভাবে তালগাছসহ বড় গাছ লাগানো উপকারী হতে পারে। গ্রামে খোলা মাঠে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থাও বাড়ানো প্রয়োজন।
এখন দরকার গণসচেতনতা
বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও সচেতনতা থাকলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণা চালানো জরুরি। যেমন মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা মানতে শিখেছে, তেমনি বজ্রপাতের ক্ষেত্রেও সচেতন হতে হবে।
মনে রাখতে হবে—
“বজ্রপাতের ভয় নয়, সচেতনতাই হোক সুরক্ষা।”
মো: শোয়েব হোসেন (লেখক)
শিক্ষক, গবেষক, বিশ্লেষক, সামাজিক ও মানবিক কর্মী।