নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
ঢাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দিনের আলো কিংবা গভীর রাত—কোনো সময়ই নিরাপদ মনে করছেন না নগরবাসী। সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রোববার বিকেলে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে প্রকাশ্যে গুলি করে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার ছিনিয়ে নেয় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। বিকেল ৩টার দিকে জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহত ব্যবসায়ী লোকমান হোসেনকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, লোকমান একজন মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী। তিনি শাপলা চত্বর এলাকায় চলাচলের সময় মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন অস্ত্রধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তার হাত ও পায়ে তিনটি গুলি লাগে। এরপর তার কাছে থাকা ডলারভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
একই দিনে গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ এলাকায় ঘটে আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। আব্দুল মান্নান (২৭) নামে এক যুবকের উরুতে লোহার রড ঢুকিয়ে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহতের স্বজনদের দাবি, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিচিত দুই ব্যক্তি মহসিন ও রাজন ওরফে বাঘা তার ওপর হামলা চালায়। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তরা পলাতক রয়েছে।
এর আগে ঈদুল আজহার আগের রাতে রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় ডিবি পুলিশের পরিচয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ী হরিপদ পাল ও তার প্রতিষ্ঠানের এক ব্যবস্থাপককে মাইক্রোবাসে তুলে নেয় একটি প্রতারক চক্র। পরে মাদক থাকার অভিযোগ তুলে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তাদের কাছ থেকে ৫৭ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে কমলাপুর এলাকায় তাদের ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নয়জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ডিবি পুলিশের জ্যাকেট, খেলনা পিস্তল, ওয়াকিটকি, হাতকড়া ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্যদিকে ঈদের ছুটি শেষে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় ফেরা দুই নারী মোহাম্মদপুরে নিজ বাসার সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন। অটোরিকশা থেকে নেমে বাসার গেট খোলার আগেই অস্ত্রের মুখে তাদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পরে তারা মিনি ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত চলে যায় বলে জানা গেছে।
রাজধানীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান চালিয়ে সম্প্রতি ২ হাজার ৮৪৪ জনকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপি। এর মধ্যে ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজের সংখ্যাই বেশি। তবে গ্রেফতার অভিযানের পরও অপরাধের মাত্রা কমছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় টহল পুলিশের কার্যক্রম নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক নাগরিক।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মে-২০২৬ মাসের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক মাসে সারাদেশে গণপিটুনির ৬৬টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে রাজধানী ঢাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও প্রকাশ্যে অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় রাজধানীতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ দমনে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত টহল জোরদার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।