নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
দেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনের মামলাগুলোর বিচারহীনতার হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, এসব ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়—বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।
রাজধানীর শাহবাগে আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, শিশুদের ওপর সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইন থাকলেই হবে না, প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও কঠোর বাস্তবায়ন।
বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপের তথ্য তুলে ধরে আলোচনায় জানানো হয়, দেশে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জনই কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশু যৌন নির্যাতনের মামলার বিচার কার্যক্রমের চিত্রও হতাশাজনক—দণ্ডাদেশের হার মাত্র ২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ মামলায় অপরাধীরা শাস্তি থেকে রেহাই পাচ্ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শিশু ধর্ষণের অন্তত ৪৫৬টি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের বেশি সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার শত শত মামলার মধ্যে খুব সামান্য অংশেই দণ্ড কার্যকর হয়েছে।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত দেশে ৯৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও রয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে।
বৈঠকে ভুক্তভোগী এক শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, শুধু বিচারের দাবি নয়, ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবার যেন এমন নির্মমতার শিকার না হয়—সেই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে।
গোলটেবিল আলোচনায় জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার বলেন, শিশু সুরক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এ বিষয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স ও পৃথক কমিশন গঠনের প্রস্তাবও তিনি দেন। পাশাপাশি অপরাধীদের তথ্যভাণ্ডার তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি প্রযুক্তির অপব্যবহার, অনলাইন অপরাধ ও মাদক-জুয়ার বিস্তারকে শিশুদের জন্য নতুন ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
আলোচনা শেষে শিশু সুরক্ষা জোরদারে ১০ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, জেলা ও উপজেলায় পৃথক সুরক্ষা ডেস্ক, দ্রুত তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থা, জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি, জাতীয় ডাটাবেস, গণমাধ্যম নীতিমালা এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি, যেখানে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে।