• সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০৩:২৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
দৌলতপুরে কাঁচারিপাড়ায় দেবরের হাতে ভাবি ও শিশু ভাতিজা খুন নীলফামারীতে জামায়াতের পেশাজীবি বিভাগের দায়িত্বশীল বৈঠক ও ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত কিশোরগঞ্জে পরকীয়ার জেরে হত্যা: ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসামি গ্রেপ্তার প্রবীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবসান ও ঠাকুরগাঁওয়ের অভিভাবক শূন্যতা ‘জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে বিএনপিতে পদ থাকবে না’ এমপি জালালের হুঁশিয়ারি আর্নে স্লটকে বরখাস্ত করল লিভারপুল! ক্রিকেট বোর্ড হবে জনগণের, কোনো গ্রুপের না জঙ্গল সলিমপুরে কোনো সন্ত্রাসীর অভয়ারণ্য থাকবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দীর্ঘ ২৪ বছর ইমামতির পর মাওলানা আবু বকর ছিদ্দিককে বিদায় সংবর্ধনা বীরগঞ্জে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকীতে বৃক্ষরোপণ করলেন-মনজুরুল ইসলাম

প্রবীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবসান ও ঠাকুরগাঁওয়ের অভিভাবক শূন্যতা

প্রতিবেদক / ৮ বার
আপডেট : রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

সাকিব আহসান
প্রতিবেদক

গণতন্ত্রের জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রবীণ রাজনৈতিক নেতারা কেবল দলীয় পরিচয়ের প্রতিনিধিই ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন সমাজের মধ্যস্থতাকারী, সংকট নিরসনের কারিগর এবং স্থানীয় জনজীবনের নৈতিক অভিভাবক। উত্তরাঞ্চলের জেলা ঠাকুরগাঁওও এর ব্যতিক্রম নয়। সময়ের প্রবাহে জেলার অনেক অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেছেন বা সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে গেছেন। ফলে একটি প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে প্রবীণ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে?

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনীতিতে একসময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। প্রবীণ নেতারা রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় উদ্যোগী হতেন। নির্বাচন পরবর্তী উত্তেজনা প্রশমিত করা, দলীয় কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কিংবা স্থানীয় বিরোধের সমাধানে তাঁদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন অনেক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাঁদের উপস্থিতি বিভিন্ন সংকটের সময়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছিল। তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি ধারণ করতেন। এই রাজনৈতিক পরিপক্বতা স্থানীয় গণতান্ত্রিক পরিবেশকে তুলনামূলকভাবে সহনশীল রাখতে সহায়তা করেছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রবীণ নেতৃত্বের সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির চরিত্রেও পরিবর্তনের আলোচনা বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আবেগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার জায়গায় স্বল্পমেয়াদি কৌশল প্রাধান্য পাচ্ছে।
রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, যখন মধ্যপন্থী ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পায়। জনপরিসরে সংলাপের জায়গা সংকুচিত হয় এবং চরমপন্থী বক্তব্যের বিস্তার ঘটে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, গণতন্ত্রের শক্তি কেবল নির্বাচন নয়; বরং এমন নেতৃত্বের মধ্যেও নিহিত, যারা সংঘাতের মুহূর্তে সংযমের আহ্বান জানাতে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে “সন্ত্রস্ত রাজনীতি” বা ভয়ভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঝুঁকির বিষয়টিও আলোচনায় আসে। যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নীতি ও কর্মসূচির পরিবর্তে ভয়, প্রভাব বা প্রতিহিংসার মাধ্যমে পরিচালিত হতে শুরু করে, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা একে গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করেন।

তবে পরিস্থিতিকে একপাক্ষিকভাবে দেখাও সমীচীন নয়। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। তরুণ নেতারা প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং নতুন রাজনৈতিক ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। চ্যালেঞ্জ হলো এই নতুন নেতৃত্ব কতটা প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, সহনশীলতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার উত্তরাধিকার ধারণ করতে পারবে।

ঠাকুরগাঁওয়ের মতো জেলায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী রাখতে হলে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। প্রবীণ নেতৃত্বের অবদান সংরক্ষণ, তাঁদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করা এবং তরুণদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা বাড়ানো সময়ের দাবি।

প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটি শূন্যতা সৃষ্টি করে। তবে সেই শূন্যতা যদি নতুন প্রজন্মের দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে পূরণ করা যায়, তাহলে তা সংকট নয়, বরং নবায়নের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে যদি সংলাপের পরিবর্তে ভয়, অংশগ্রহণের পরিবর্তে বর্জন এবং মতবিনিময়ের পরিবর্তে সংঘাত স্থান দখল করে, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

অতএব, ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কেবল কে ক্ষমতায় থাকবে তার ওপর নয়; বরং কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে তার ওপর। ইতিহাসের শিক্ষা হলো অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ এবং নাগরিক সচেতনতাকেই সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও

ফেসবুকে আমরা