• শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০২:২০ পূর্বাহ্ন

ঈদের আনন্দ, ‘বুস্ট গ্যাস’ আর পীরগঞ্জের ঝুঁকিপূর্ণ উচ্ছ্বাস

প্রতিবেদক / ২৪ বার
আপডেট : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে ঈদ মানেই আনন্দ, আড্ডা, বন্ধুদের পুনর্মিলন, রাতজাগা ঘোরাঘুরি আর মোটরসাইকেলের দীর্ঘ বহর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই আনন্দের একটি অংশ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক দিকে মোড় নিচ্ছে। তরুণদের একাংশের কাছে এখন ঈদের উচ্ছ্বাস যেন রূপান্তরিত হয়েছে তথাকথিত “বুস্ট গ্যাস” বা Nitrous Oxide নির্ভর কৃত্রিম উত্তেজনায়। স্থানীয়ভাবে কেউ একে “হাসির গ্যাস”, কেউ “বেলুন গ্যাস”, আবার কেউ “নাইট্রো” বলেও চেনে।

ঈদের রাত ঘিরে পীরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেল স্টান্ট, উচ্চগতির রাইডিং, হুট করে ব্রেক কষা, রাস্তাজুড়ে রেসিং—এসব এখন নতুন কিছু নয়। কিন্তু উদ্বেগের জায়গা হলো, এসবের পেছনে কেবল আবেগ বা তারুণ্যের উচ্ছ্বাস নয়, বরং এক ধরনের কৃত্রিম নেশাও জড়িয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বাজারে সহজলভ্য ছোট ক্যানিস্টার বা বেলুনে ভরা নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণের পর সাময়িক উন্মাদনা, হাসি, মাথা ঝিমঝিম ভাব ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়। আর ঠিক এই অবস্থাতেই কেউ মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেলে বসলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত ঝুঁকি থাকে না, জননিরাপত্তারও হুমকি হয়ে ওঠে।
অনেকেই যুক্তি দেন—ঈদের সময় দু-চারটি দুর্ঘটনা “স্বাভাবিক”। মানুষ আনন্দ করবে, একটু বেপরোয়া হবেই। কিন্তু এই যুক্তি বিপজ্জনকভাবে দায়হীন। কারণ দুর্ঘটনা কখনোই উৎসবের অনিবার্য অংশ হতে পারে না। একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা মানে শুধু একটি আহত শরীর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের আতঙ্ক, হাসপাতালের করিডোর, আজীবনের পঙ্গুত্ব কিংবা কোনো মায়ের সন্তান হারানোর শোক।
পীরগঞ্জের সড়ক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক গ্রামীণ সড়ক সরু, কোথাও আলোর ব্যবস্থা দুর্বল, কোথাও আবার রাস্তার ধারে অবাধে মানুষের চলাচল। ঈদের সময় এসব রাস্তায় শিশু-কিশোর, পরিবার কিংবা পথচারীর উপস্থিতি আরও বেড়ে যায়। সেই পরিবেশে কৃত্রিম উত্তেজনায় চালানো দ্রুতগতির মোটরসাইকেল কার্যত চলন্ত বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।

সমস্যার আরেকটি দিক হলো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণকে “সাহস”, “স্টাইল” বা “এন্টারটেইনমেন্ট” হিসেবে দেখা হয়। কেউ ভিডিও ধারণ করছে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড দিচ্ছে, কেউ আবার বাহবা দিচ্ছে। ফলে বিপজ্জনক আচরণটি ধীরে ধীরে সামাজিক স্বীকৃতি পেয়ে যাচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো—একটি ভাইরাল ভিডিওর পেছনে হয়তো লুকিয়ে থাকে মৃত্যুঝুঁকি।

এই পরিস্থিতিতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, রাতভর বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো “তরুণ বয়সের স্বাভাবিক বিষয়” নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও ভূমিকা নিতে হবে। ঈদের আনন্দকে নিরাপদ রাখার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে—যেখানে আনন্দ থাকবে, কিন্তু দায়িত্ববোধও থাকবে।
প্রশাসনেরও কিছু বাস্তবধর্মী উদ্যোগ প্রয়োজন। ঈদের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নজরদারি বাড়ানো, হেলমেটবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, গভীর রাতে ঝুঁকিপূর্ণ রাইডিং নিয়ন্ত্রণ এবং সন্দেহজনক নেশাদ্রব্য বিক্রির ওপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য বিকল্প সাংস্কৃতিক আয়োজনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, যাতে উচ্ছ্বাসের প্রকাশ বিপজ্জনক পথে না যায়।

ঈদ আনন্দের উৎসব, শোকের নয়। সাময়িক উন্মাদনার জন্য যদি একটি জীবনও ঝরে যায়, তবে সেই আনন্দের মূল্য অনেক বেশি হয়ে যায়। পীরগঞ্জের তরুণ সমাজকে বুঝতে হবে—গতির চেয়ে জীবনের মূল্য বড়, আর কৃত্রিম উত্তেজনার চেয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরাই প্রকৃত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও

ফেসবুকে আমরা