ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে ব্রিকস জোটের সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে চীন, রাশিয়া, ইরান, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ সদস্যদেশগুলোর নেতারা এক টেবিলে বসেন। তবে রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে জোটটির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রিকস সদস্যদের প্রচলিত নিয়মের অনুসারী না হয়ে নিয়ম সৃষ্টিকারী হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, ব্রিকস কোনো দেশের বিরুদ্ধে গঠিত জোট নয়।
চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোর কাছে ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা প্রভাবের বাইরে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। তবে ভারতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। দেশটি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীন, রাশিয়া, ইরানসহ অন্যান্য ব্রিকস সদস্যের সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।
মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এবারের সম্মেলনে সদস্যরা একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করেছেন। ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’য় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানানো হলেও কোনো দেশকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের বিষয়ে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে ব্রিকস। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি এবং দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়া বা দীর্ঘায়িত করতে পারে—এমন পদক্ষেপেরও বিরোধিতা করা হয়েছে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো উল্লেখ এবারের ঘোষণায় রাখা হয়নি।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একতরফাভাবে বাড়ানো শুল্ক ও বাণিজ্য-সীমাবদ্ধতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সদস্যদেশগুলো। একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা হলেও ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
সম্মেলনের বাইরে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বৈঠক করেন। যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটি উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি বৈঠক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, উত্তেজনা কমানো এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ব্রিকস সদস্যদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তেহরানের কাছে ব্রিকস এমন একটি মঞ্চ, যেখানে পশ্চিমা চাপের বাইরে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরও এবারের সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখনো বিদ্যমান। সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের ভারত সফরকে তাই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার, পরিবহন যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবে দুই দেশের সম্পর্কে কতটা অগ্রগতি আনতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নয়াদিল্লির এবারের সম্মেলন থেকে স্পষ্ট হয়েছে, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে আলোচনা ও সহযোগিতার পরিসর ক্রমেই বাড়ছে। তবে সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং পারস্পরিক বিরোধের কারণে ব্রিকস ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর বিকল্প বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।