• শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০১:১৯ পূর্বাহ্ন

মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে জামায়াতি ও সালাফি মতবাদ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ

প্রতিবেদক / ২২ বার
আপডেট : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

দেশের মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের পাঠ্যক্রমে আকাইদ ও ফিকহ বিষয়ক পাঠ্যবইয়ে ব্যাপক পরিবর্তন, সংযোজন ও বিয়োজন আনা হয়েছে বলে দাবি করে বিস্তৃত সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন ড. মাহবুবুর রহমান। তাঁর মতে, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে পাঠ্যবইয়ের ঐতিহ্যবাহী আকিদাগত কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে এবং নতুন একটি মতাদর্শিক প্রবণতা প্রতিফলিত হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও হানাফি মাযহাবের অনুসারী। দীর্ঘদিন ধরে ২০১০ সালের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী খ্যাতিমান আলেম ও ফকিহদের রচিত বইসমূহ পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তা পাঠদান চলেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের জন্য পাঠ্যক্রম পরিমার্জনের নামে আকাইদ, ফিকহ ও আখলাক বিষয়ে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ড. মাহবুবুর রহমানের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, নতুন পাঠ্যবইয়ে কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে নতুন ব্যাখ্যা সংযোজন করা হয়েছে এবং কিছু অধ্যায় পুনর্গঠন করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মতভেদ ও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

তিনি তার বিশ্লেষণে শ্রেণিভিত্তিকভাবে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবর্তনের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

নবম–দশম শ্রেণি সংক্রান্ত অভিযোগ

তিনি দাবি করেন, নবম ও দশম শ্রেণির আকাইদ বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে তাসাউফ, অলিগণের মর্যাদা, মাজার জিয়ারত, শবে বরাত, নফল ইবাদত, দরুদ ও কিছু দোয়ার বিষয়বস্তু বাদ দেওয়া হয়েছে বা পরিবর্তন করা হয়েছে।
১. তাসাউফ ও কামেল মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কিত অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
২. অসিলা দিয়ে দোয়া করা সংক্রান্ত অংশকে অবৈধ বা মাকরুহ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি।
৩. মেরাজে রাসূল (সা.) আল্লাহকে দেখেছেন—এ সংক্রান্ত আলোচনার অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
৪. ইলমুল বেলায়েত ও বুজুর্গদের সোহবতের গুরুত্ব বাদ দেওয়া হয়েছে।
৫. রওজা মুবারক ও পবিত্র স্থানসমূহ জিয়ারতের ফজিলত সম্পর্কিত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।

অষ্টম শ্রেণি সংক্রান্ত পরিবর্তন

৬. তরিকত, মারেফত, তাসাউফ ও অলিগণের মর্যাদা সংক্রান্ত অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
৭. শবে বরাতের ইবাদত ও রোজা সংক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
৮. ঈদের রাতে নফল ইবাদত বিষয়ক অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
৯. হায়াতুন্নবী ও নবীগণের রওজা সম্পর্কিত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
১০. দরুদ ও সালামের ফজিলত সংক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
১১. জুমার আগে ও পরে সুন্নত সম্পর্কিত কিছু ব্যাখ্যা বাদ দেওয়া হয়েছে।
১২. সালাতুত তাসবীহ অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।

সপ্তম শ্রেণি সংক্রান্ত পরিবর্তন

১৩. তাওহীদের স্তরসমূহে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
১৪. সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা বিষয়ক হাদিস বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি।
১৫. চার মাযহাব অনুসরণের বাধ্যবাধকতা পরিবর্তন করা হয়েছে।
১৬. সালাতের কিছু নিয়ম ও দাঁড়ানোর পদ্ধতি সংক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
১৭. নারীদের নামাজের ভিন্নতা সংক্রান্ত অংশ পরিবর্তন করা হয়েছে।
১৮. কাজা সালাত সম্পর্কিত অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
১৯. মৃত ব্যক্তির কাজা সালাত বিষয়ক মাসআলা বাদ দেওয়া হয়েছে।
২০. বেতরের রাকাত সংখ্যা সম্পর্কিত ব্যাখ্যায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
২১. জানাজার দোয়া ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
২২. তারাবির রাকাত সংখ্যা ও দোয়া সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
২৩. শবে বরাত বিষয়ক অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
২৪. মাজার জিয়ারত ও অলিগণের মর্যাদা বিষয়ক অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
২৫. মোবাইল ফোনের ব্যবহার বিষয়ক অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণি সংক্রান্ত পরিবর্তন

২৬. কালিমা ও ঈমান সংক্রান্ত কিছু অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
২৭. দরুদ শরীফের ফজিলত বিষয়ক অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
২৮. শাফায়াত সম্পর্কিত দোয়ার অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
২৯. সালাতের মাকরুহ সময় সম্পর্কিত অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
৩০. নিয়ত সম্পর্কিত আরবি অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
৩১. কদমবুচি বিষয়ক অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে।

পঞ্চম শ্রেণি সংক্রান্ত পরিবর্তন

৩২. বিদআতের শ্রেণিবিন্যাস বাদ দেওয়া হয়েছে।
৩৩. জান্নাতের নামসংক্রান্ত ব্যাখ্যায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
৩৪. অলিগণের কারামত সম্পর্কিত কিছু অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
৩৫. তায়াম্মুম ও অপবিত্রতা সংক্রান্ত মাসআলায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
৩৬. তারাবির দোয়া ও তাসবীহ বাদ দেওয়া হয়েছে।
৩৭. জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা সম্পর্কিত ব্যাখ্যায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
৩৮. নারীদের ইতিকাফ সম্পর্কিত অংশ পরিবর্তন করা হয়েছে।
৩৯. তাজকিয়া ও কামেল মুর্শিদ বিষয়ক অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ ও বিশ্লেষণ

ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, এসব পরিবর্তনের ফলে পাঠ্যক্রমে সুন্নি ঐতিহ্যভিত্তিক বহু ব্যাখ্যা ও মাসআলা বাদ পড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে নতুন মতবাদভিত্তিক ব্যাখ্যা সংযোজন করা হয়েছে। তাঁর মতে, এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আকিদাগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে এসব পরিবর্তনের পেছনে উদ্দেশ্য কী এবং কোন নীতির ভিত্তিতে করা হয়েছে—তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ভিন্নমত ও প্রতিক্রিয়া

এদিকে শিক্ষা ও ধর্মীয় মহলের একাংশ মনে করছেন, পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, মানোন্নয়ন এবং ব্যাখ্যাগত ভারসাম্য আনার উদ্দেশ্যেই এসব পরিবর্তন করা হয়ে থাকতে পারে। তবে অন্য একটি অংশ বিষয়টিকে আকিদাগত ও মতাদর্শিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ধর্মীয় শিক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, বিস্তৃত পর্যালোচনা এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও মতভেদ আরও বাড়তে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও

ফেসবুকে আমরা