নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
দেশের বন্ধ হয়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো পুনরায় চালুর ব্যাপারে সরকার দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায়ন ও সংস্কারের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আখচাষিদের স্বার্থ, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং মিলগুলোর লাভজনক পরিচালনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শনিবার (৯ মে) দুপুরে পঞ্চগড় চিনিকল কারখানা চত্বরে আখচাষিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে তিনি চিনিকলের বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় আখচাষি ও শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
মন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এগুলো দেশের মানুষের সম্পদ এবং স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব মিল সচল থাকলে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিকসহ অসংখ্য মানুষের জীবিকা সচল থাকে। তাই বন্ধ শিল্পকারখানাগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে এনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফেরানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের বেশ কয়েকটি চিনিকল বন্ধ রয়েছে এবং চালু থাকা মিলগুলোর অনেকগুলোই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। অধিকাংশ কারখানার বয়স ৫০ থেকে ৭০ বছর অতিক্রম করায় সেগুলোর যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, সংস্কার ও পুনর্বিন্যাস ছাড়া এসব মিলকে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “যদি চালা ঠিক না করে চিনি বানানো হয়, তাহলে বৃষ্টি এলে সব শরবত হয়ে যাবে।” এ মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দেন, কেবল নামমাত্র চালুর পরিবর্তে টেকসই ও কার্যকর পুনর্গঠনের মাধ্যমে চিনিকলগুলোকে পুনরায় সচল করতে চায় সরকার।
তিনি আরও বলেন, কোনো কোনো মিল নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে চালু করা হবে, কোথাও অবকাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন হবে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিকল্প পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হতে পারে। তবে প্রতিটি সিদ্ধান্তেই কৃষক, শ্রমিক ও স্থানীয় অর্থনীতির স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, একটি শিল্পকারখানা চালু থাকলে তা শুধু প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করে না, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিকে সচল রাখে। তাই বন্ধ মিলগুলো পুনরায় চালু করা দারিদ্র্য হ্রাস ও স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য মুহম্মদ নওশাদ জমির এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম, পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ হোসেন, পঞ্চগড় সুগার মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুজ্জামান, আখচাষি প্রতিনিধি, শ্রমিকনেতা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সভা শেষে বন্ধ চিনিকল পুনরায় চালুর দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি শিল্পমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন শ্রমিক ও আখচাষিরা।
উল্লেখ্য, পঞ্চগড় সুগার মিলস লিমিটেড ১৯৬৬-৬৯ সালে দৈনিক ১ হাজার ১৬ টন আখ মাড়াই সক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৬৯-৭০ সালে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরু করে। তবে ব্যয় বৃদ্ধি, আখ উৎপাদন হ্রাস ও দীর্ঘদিনের লোকসানের কারণে ২০২০ সালে মিলটির লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা। একই বছরের ডিসেম্বরে দেশের আরও ছয়টি চিনিকলের সঙ্গে পঞ্চগড় চিনিকলের মাড়াই কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়।