• শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০২:২৩ পূর্বাহ্ন

কৃষি ও শিল্পের জোয়ারে ঢাকা-চট্টগ্রামের পর দেশের ‘তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল’ হওয়ার পথে উত্তরাঞ্চল

প্রতিবেদক / ৪৮ বার
আপডেট : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

​নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্প ও সেবা খাতের পাশাপাশি একমাত্র নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনমুখী খাত হিসেবে অবদান রেখে চলেছে কৃষি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপিতে পৌনে ১৩ শতাংশ অবদান রাখা কৃষিখাতের ওপর ভর করে এবার বড় অর্থনৈতিক বিপ্লবের সুবাতাস বইছে উত্তরাঞ্চলে। চলতি শুষ্ক মৌসুমে কেবল দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চল থেকেই ন্যূনতম ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের ফসল জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষির এই অভাবনীয় সাফল্য এবং দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পায়নের কারণে উন্নত ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর দেশের ‘তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে সমগ্র উত্তরাঞ্চল।  ​আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই বাজারে আসতে শুরু করবে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দিনাজপুরের প্রসিদ্ধ লিচু, রংপুরের হাঁড়িভাঙা আম এবং ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘বৃন্দাবনি’ আম। এই ফল ব্যবসাকে ঘিরে কুরিয়ার, দূরপাল্লার পরিবহন এবং খাঁচা তৈরির কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় নিম্নআয়ের হাজার হাজার মানুষ। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এবার দিনাজপুর অঞ্চলে ৫ হাজার ৪৮৪ হেক্টর জমি থেকে ৩৬ হাজার মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা থেকে আয় হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। ১৫ মে থেকে আগাম ‘মাদ্রাজ’ জাতের লিচু বাজারে আসতে শুরু করেছে। লিচু মৌসুমে বাগান রক্ষণাবেক্ষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

​একইভাবে জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর রংপুরের হাঁড়িভাঙা আমের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ বহুগুণ বেড়েছে। চলতি মৌসুমে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করে রংপুর অঞ্চলে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে আধুনিক হিমাগার বা বিশেষায়িত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে চাষিরা কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

​এক সময় রংপুর অঞ্চলে কাজ ও খাদ্যাভাবের কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় ‘মঙ্গা’ বিরাজ করলেও, বর্তমানে এক ফসলি জমি তিন থেকে চার ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমোর ও যমুনেশ্বরী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা ছোট-বড় প্রায় চার শতাধিক চরে এখন ভুট্টা, কাউন, বাদাম, মিষ্টি আলু ও মিষ্টি কুমড়ার ব্যাপক ফলন হচ্ছে। চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অতিরিক্ত ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে, যাকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলে বড় বড় পশুখাদ্য কারখানা বা ফিড মিল গড়ে উঠেছে।
​দিনাজপুরে চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৭১ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যেখান থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি আয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ওপর নির্ভর করে সচল রয়েছে শত শত অটো রাইস মিল। এছাড়া পঞ্চগড় জেলাতেও বোরো ধানের পাশাপাশি মরিচ, গম ও আলু চাষে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। কেবল মওসুমি ফসল শুকনা মরিচ থেকে ৭০০ কোটি, গম থেকে ২০০ কোটি এবং আলু থেকে ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্য আশা করা হচ্ছে।
​পাশাপাশি, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত পঞ্চগড় জেলা এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার একর জুড়ে বিস্তৃত পঞ্চগড়ের চা বাগান এখন গুণগত মানে ভারতের দার্জিলিং ও শিলিগুড়ির চা শিল্পকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। দুই যুগ আগে যে জমির মূল্য ছিল মাত্র ২ হাজার টাকা, আজ তা এক কোটি টাকায় পাওয়াও দুষ্কর।

​এদিকে গমের জন্য বিখ্যাত ঠাকুরগাঁও জেলা এখন আর কেবল সনাতন কৃষিতে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ কমলা ও মাল্টার বাণিজ্যিক বাগান। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনা কাটিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা এখন বাণিজ্যিক ও শিক্ষানগরীতে রূপান্তরের পথে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্থানীয় নেতৃত্বের হাত ধরে জেলাটিতে ইতোমধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া পরিত্যক্ত বিমানবন্দরটি পুনরায় সচল করার প্রক্রিয়া এবং নার্সিং কলেজ স্থাপনসহ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
​কৃষির পাশাপাশি শিল্পখাতেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরাঞ্চল। নীলফামারীর ‘উত্তরা ইপিজেড’-এ একাধিক বৃহৎ ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইপিজেডের বাইরেও বিপুল সংখ্যক পরচুলা কারখানা ও মিনি গার্মেন্টস গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এই অঞ্চলের নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশই সরাসরি চীনা অংশীদারিত্ব ও বৈদেশিক বিনিয়োগে পরিচালিত হচ্ছে। কৃষি বিপ্লবের সাথে এই ভারী শিল্পায়নের মেলবন্ধন ঘটায় উত্তরাঞ্চল এখন দেশের তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও

ফেসবুকে আমরা