নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরীতে বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মানুষের দুশ্চিন্তাও। বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, দেশীয় মাছের আশঙ্কাজনক হ্রাস এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সংকটে জেলে-কৃষকসহ নিম্নআয়ের হাজারো পরিবার এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। একসময় যে বর্ষা ছিল জীবিকার আশীর্বাদ, এখন তা হয়ে উঠেছে টিকে থাকার নতুন শঙ্কা।
বর্ষার পানি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হওয়ায় উপজেলার নিচু এলাকার রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশ ইতোমধ্যে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের ধারণা, অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো হাওরাঞ্চল পানিতে থৈথৈ করবে। তবে প্রকৃতির এই চিরচেনা রূপ এবার মানুষের মনে স্বস্তির বদলে তৈরি করছে উৎকণ্ঠা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়লেই খাল-বিল ও জলাশয়ে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য দেখা যেত। হাওরের জেলে পরিবারগুলো মাছ ধরেই সংসার চালাত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরা এবং জলাশয় ভরাটের কারণে হাওরের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে।
উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়, শুকনো মৌসুমে খালিয়াজুরীর জলাভূমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর হলেও বর্ষায় তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৩ হাজার ২৮০ হেক্টরে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় মাছ ও শুটকি উৎপাদন হয়েছিল ১৯ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৭৪৯ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টনে। এতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
এদিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এবার বোরো ফসলেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৮০ শতাংশ ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়েছে। ফলে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে চরম আর্থিক সংকট।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। উপজেলার ২৫ হাজার ২২২ কৃষক পরিবারের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার পরিবার। তবে সরকারি সহায়তা পাবেন ৭ হাজার ৮৩১ পরিবার।
লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা ফুলু মিয়া বলেন, “আগে বর্ষায় পানি আসলে আনন্দ হতো, এখন ভয় লাগে। মাছও নাই, কাজও নাই—সংসার কেমনে চলবো বুঝতেছি না।”
কৃষক জাকির হোসেন বলেন, “এবার যে ক্ষতি হইছে, এটা আমাদের জীবনের বড় ধাক্কা। একমাত্র বোরো ফসলই ছিল ভরসা, সেটাও ডুবে গেছে।”
নয়াপাড়া গ্রামের প্রবীণ জেলে পতাকী বর্মণ জানান, “১০ বছর আগেও দিনে ১০-১৫ কেজি মাছ ধরতাম। এখন ২-৩ কেজির বেশি পাওয়া যায় না। অনেকে বিষ দিয়ে মাছ ধরে—এতে মাছ যেমন শেষ হচ্ছে, তেমনি হাওরের প্রাণও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।”
স্থানীয় মৎস্য আড়ৎদার আক্তার হোসেন তালুকদার বলেন, আগে প্রতিদিন আড়তে কয়েক মণ দেশীয় মাছ আসত, এখন মোটে এক মণ মাছও পাওয়া যায় না। বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে হাওরে দেশীয় মাছ টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে আশঙ্কা তার।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ উপায়ে মাছ ধরা হলেও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। একইসঙ্গে জলাশয়গুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও খনন কার্যক্রমেও দৃশ্যমান উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, খালিয়াজুরীতে ২০ একরের বেশি ৩৮টি এবং ২০ একরের নিচে ৩৩টি ইজারাযোগ্য সরকারি জলমহাল রয়েছে। গত অর্থবছরে ৪৭টি জলমহাল ইজারা দিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, মৎস্যসম্পদ রক্ষায় উপজেলার পাঁচটি জলাশয়কে অভয়াশ্রম ঘোষণার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অভয়াশ্রম ঘোষণা হলে সেখানে সারা বছর মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে এবং নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের জন্য সরকার তিন মাসের সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অলিদুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবারকে প্রতি মাসে ১৫ কেজি চাল ও তিন হাজার টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ঈদের আগেই প্রথম কিস্তি বিতরণের চেষ্টা চলছে।
তবে স্থানীয়দের মতে, এই সহায়তা ক্ষতির তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তাদের ভাষায়, “আগে বর্ষার পানির সঙ্গে জীবন চলত, এখন পানির সঙ্গে শুধু দুশ্চিন্তাই বাড়ে।”