দেশের অর্থনীতির গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসন, বিনিয়োগ বাড়ানো, আমদানি-রফতানি সহজ করা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট চিহ্নিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পথরেখা নিয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জ্বালানি সংকট, পণ্য পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা, বন্দর ও কাস্টমসে জটিলতাসহ আমদানি-রফতানির বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন।
বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নেওয়া পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ তুলে ধরেন। পরে প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফেরার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছিল। দুর্ঘটনাজনিত সমস্যা এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে দীর্ঘদিনের সমস্যা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে সমাধানের পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এসব সমস্যা রাতারাতি বা ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যবসায়ী নেতারা সরকারের পরিকল্পনা ও আশ্বাসকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমসে আমদানি-রফতানি সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের বিষয়ে তারা আশাবাদী। একদিনে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও সরকারের পরিকল্পনা ও আশ্বাসে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি সংকটের বিষয়ে সরকারের বিস্তারিত পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ ব্যবসায়ীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। এতে তারা সন্তুষ্ট। সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে আস্থার ঘাটতি ছিল, এ ধরনের বৈঠকের মাধ্যমে তা দূর হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে বলেন, শিল্প ও ব্যবসা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ে। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্যাসের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা বহুমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানান, বর্তমানে সচল ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি ২০২৮ সালের আগেই সম্ভব হলে তৃতীয় টার্মিনাল এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে মোট পাঁচটি ভাসমান টার্মিনালে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশে প্রায় ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। প্রথম ধাপ সফল হলে আরও ১৫০টি কূপ খননের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হবে।
গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বহুমুখী জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তেল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য আনার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে কৃষি খাতেও উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যপণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রোববার কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে দেশে উৎপাদন সম্ভব এমন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে গবেষণা, উন্নত জাত, আধুনিক প্রযুক্তি, সেচ ও যান্ত্রিকীকরণ সুবিধা দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।
কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের অপচয় কমানো এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানি বাড়াতে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, উন্নত প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, কৃষি, শিল্প, বন্দর ও কাস্টমসসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোই এখন প্রধান লক্ষ্য। ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের পথও অব্যাহত থাকবে।